
মো রফিকুল ইসলাম রফি
রামকলার রূপেশ্বরী
বাবার হাত নীলফামারী সদরের খোকসাবাড়ী ইউনিয়নে অবস্থিত রামকলার রূপেশ্বরী গ্রামটি আমার কাছে কেবল একটি মানচিত্রের বিন্দু নয়, এটি আমার অস্তিত্বের আতুঁড়ঘর। যতবার আমি এই গ্রামের ধূলোমাখা কাঁচা রাস্তায় পা রাখি, ততবার আমার মনে পড়ে যায় সেই ছোটবেলার কথা, যখন আমার পৃথিবীটা ছিল বাবার শক্ত হাতের মুঠোয়। বাবার সাথে হাটের সেই অমলিন স্মৃতি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই হাটবারের কথা। রামকলার হাট মানেই ছিল আমার কাছে এক পরম উত্তেজনার দিন। ছোটবেলায় যখনই হাটবার আসত, আমি বাবার পাজামা ধরে বায়না ধরতাম সাথে যাওয়ার জন্য। বাবাও হাসিমুখে আমাকে তৈরি করে নিতেন। বাবার সেই বড় হাতটার মধ্যে যখন আমার ছোট হাতটা রাখতাম, তখন মনে হতো পুরো পৃথিবীটা আমার হাতের নাগালে। আমরা যখন রূপেশ্বরী গ্রামের সেই মেঠোপথ দিয়ে হাঁটা শুরু করতাম, দুই পাশে শাঁ শাঁ শব্দে দুলত বাঁশঝাড়। বাবা রাস্তার পাশের প্রতিটি গাছ আর ক্ষেত-খামারের গল্প শোনাতেন। কোন জমিতে এবার ভালো ধান হয়েছে, কোন পুকুরে বড় মাছ আছে—সবই ছিল বাবার নখদর্পণে। হাটে যাওয়ার পথে কত মানুষের সাথে দেখা হতো! ছোট-বড় সবাই বাবাকে সম্মান করত। হাটে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে যখন হারিয়ে যাওয়ার ভয় পেতাম, বাবা আরও শক্ত করে আমার হাতটা ধরতেন। সেই স্পর্শে যে নিরাপত্তা ছিল, তা আজও আমি শহরের কোনো বিলাসবহুল দালানে খুঁজে পাই না। হাটের শেষে বাবার কিনে দেওয়া সেই খাজা বা রঙিন বাতাসা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্বাদ। শেকড়ের টানে রূপেশ্বরী আজ বাবা নেই, কিন্তু রামকলার রূপেশ্বরীর প্রতিটি ধূলিকণায় আমি যেন তাঁর পায়ের ছাপ খুঁজে পাই। গ্রামের সেই কাঁচা রাস্তা বয়ে নিয়ে চলে আমাদের পূর্বপুরুষদের গল্প। আজ যখন বড় বড় গাড়িতে চড়ে সেই রাস্তা দিয়ে যাই, তখন জানালা দিয়ে বাইরের পুকুর আর ফসলের মাঠগুলো দেখে বারবার মনে পড়ে—এই তো সেই রাস্তা, যেখানে আমি আর বাবা হাতে হাত ধরে হেঁটেছি। বাবার শেখানো সেই আদর্শ আর মাটির প্রতি মমতা আমাকে আজ এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আমার কাছে তাই রূপেশ্বরীর প্রতিটি ধূলিকণা পবিত্র। কারণ এখানকার মেঠোপথেই মিশে আছে আমার বাবার ঘাম আর আমার শৈশবের রঙিন স্মৃতি। আমাদের গর্ব আমাদের গ্রাম রামকলার রূপেশ্বরী গ্রামটি আমাদের সবার হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। গ্রামের শান্ত পরিবেশ, বাঁশঝাড়ের ছায়া আর সহজ-সরল মানুষগুলোই আমাদের প্রকৃত সম্পদ। তাই তো আমরা গর্ব করে বলি: > "আমাদের শেকড়, আমাদের গর্ব—রামকলার রূপেশ্বরী গ্রাম।" > শহর থেকে যখনই আমি ফিরে আসি, গ্রামের পুকুরঘাটে বসলে মনে হয় বাবা যেন পাশেই বসে আছেন। সেই বাঁশঝাড়ের বাতাস যেন ফিসফিস করে বলে যায়, "শেকড়কে কখনো ভুলো না।" বাবা শিখিয়েছিলেন গ্রামই হলো আমাদের পরিচয়। আর সেই পরিচয়েই আমি আজ নিজেকে খুঁজে পাই রামকলার রূপেশ্বরীর এই স্নিগ্ধ জনপদে।