
mohammod maminul Islam
এলাহাবাদ-
আমার স্কুল ও ছেলেবেলা মাধ্যমিক শ্রেণির শুরুটা ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক—এই দুটি ধাপ পেরিয়ে শিক্ষাজীবনে বার্ষিক ও পাবলিক পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যেতে হয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষার পর প্রত্যেক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভর্তি হওয়ার নিয়ম চালু ছিল। পরীক্ষার ও বইয়ের চাপ কমানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই চাপই বহাল থেকেছে। অনেক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা এ চাপ মেনেই নিয়েছেন। তবে এতে লাভ না ক্ষতি—তা নিয়ে বিতর্ক ছিল এবং এখনও আছে। আমি এখানে বলতে চাই মূলত আমার স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতার কথাই। আমি স্কুলে পড়ার সময় প্রাথমিক ও মাধ্যমিককে আলাদা করে দেখার সুযোগ বা প্রয়োজন মনে করিনি। প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একই স্কুলে পড়েছি। তখন ফারসি ও উর্দুর মতো বিষয়ও সপ্তম শ্রেণির পর পড়ানো হতো। প্রত্যেক ক্লাসে আলাদা করে নতুন করে ভর্তি হতে হয়নি। বার্ষিক পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হতো তারা স্বাভাবিক নিয়মেই পরের ক্লাসে উঠে যেত। বই, পাঠ্যসূচি বা পড়ার চাপে খুব একটা পার্থক্য ছিল না। স্যাররা ক্লাসে নিয়মিত পড়াতেন, বাড়ির কাজ দিতেন এবং পরদিন তা শুনতেন। ক্লাসে মনোযোগী শিক্ষার্থীরা স্যারের পাঠেই অনেকটা এগিয়ে যেত। বাড়িতে গিয়ে আবার পড়লে আলাদা করে শেখার কিছু থাকত না। যারা ক্লাস ও বাড়ির পড়া—দুই জায়গাতেই ফাঁকি দিত, তারাই শাস্তি বা বকাঝকা পেত। আমি ছাত্র হিসেবে খুব ভালো ছিলাম না। মাঝেমধ্যে বাড়ির পড়া ঠিকমতো দিতে পারতাম না, এজন্য শাস্তি বা বকাও খেয়েছি। তবে এসএসসি প্রাইমারির মতো বাড়ি এসে কাউকে বলতে না, বরং পড়া শেষ করার চেষ্টা করতাম। মনে আছে, ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে একবার একটি বিষয়ে ফেল করেছিলাম এবং সেবার স্যারের ক্লাসে প্রমোশন পাইনি। তখন কোনো বিষয়ের দুর্বলতার জন্য প্রাইভেট পড়ার চাপ আসেনি। বাড়িতেই পড়ালেখা বাড়িয়ে দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা করেছি। কেবল নবম ও দশম শ্রেণিতে এসে কমার্সের দু-একটি বিষয়ে নিজের ইচ্ছায় কয়েক মাস স্কুলের স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েছি। নিয়মিত স্কুল ও পড়াশোনার এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করি। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ডিগ্রি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পাই। তবে পারিবারিক নানা প্রতিকূলতায় আমাদের পড়াশোনার ভিত্তি খুব মজবুতভাবে গড়ে ওঠেনি। মুক্তিযুদ্ধের এক বছর, আর্থিক টানাপোড়েন, অনিয়মিত লেখাপড়া, এসএসসির সঙ্গে বাবার দীর্ঘ তিন বছরের অসুস্থতা এবং পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যু—এই পরিস্থিতিতে বড় সংসারের সবাই কোনো রকমে চলছিল। বড় ভাই প্রথমে চাকরি, পরে ব্যবসায় যুক্ত হন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাই কলেজে উঠে ডিগ্রি ও পরে এলএলবি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পান। আমার বোনদের ক্ষেত্রে সুযোগ আরও কম ছিল। চার বোনের মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয় বাবা জীবিত থাকতেই। বাকি তিন বোন—ফরজুননাহার, কামরুন নাহার ও খালেকুন নাহার—মেট্রিকের আগে-পরে বিয়ে হয়ে যায়। আমি কলেজে ওঠার আগেই বোনদের বিয়ের পর্ব শেষ হয়। ফলে তখন এসব অনুভব করার সুযোগ হয়নি। তবুও স্কুলজীবনই আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও স্মৃতিময় সময়। প্রাইমারিতে ভর্তি হওয়ার পর স্কুলের হেড মাস্টার হযরত আব্দুল হক স্যার এবং পরে হাসেমুল হক স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি। শিক্ষকদের সামনে দাঁড়ালে আজও সেই শৈশবের ভয় ও শ্রদ্ধা একসঙ্গে অনুভব করি। অনেক স্যার আজ আর এই দুনিয়ায় নেই। শিক্ষকদের মধ্যে আব্দুল মতিন স্যারের সঙ্গে আমি তুলনামূলকভাবে সহজে কথা বলতে পারতাম—সে পরিবেশ তিনিই তৈরি করেছিলেন। স্কুল জীবন শেষে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে মামাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে। আমার মামা আব্দুল আউয়াল একসময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং একজন পরিচ্ছন্ন জনপ্রিয় জনসেবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি নিয়মিত আমাদের খোঁজখবর নিতেন এবং সামাজিক নানা কাজে যুক্ত ছিলেন। আরও দু’জন স্যারের ছেলে ছিলেন আমার সহপাঠী ও বন্ধু। আবুল হাসেম চৌধুরী স্যার এবং মনিন্দ্র হালদার স্যার পড়ানোর সময় কোনো ছাড় দিতেন না, তবে অকারণে শাস্তিও দিতেন না। হাসিমুখে পড়াতেন, খুব কঠোর ছিলেন না। স্কুলের পর কলেজে গিয়ে অনেকের সঙ্গে আর একসাথে পড়া হয়নি। কর্মজীবনে স্কুলের অনেক বন্ধুই কুমিল্লার বাইরে চলে গেছে। ফলে যোগাযোগ কমে গেছে, যদিও কারো কারো সঙ্গে আজও সম্পর্ক আছে আগের মতোই। আর যারা আজ আর এই দুনিয়ায় নেই, তাদের স্মৃতি এখনো হৃদয়ে গেঁথে আছে। বদিউল আমিন দুলাল ছিলেন এমনই একজন বন্ধু—স্কুলের পর তাঁর চিরবিদায় পর্যন্ত যার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক অটুট ছিল। সততা, নিষ্ঠা ও মিতব্যয়িতা ছিল তাঁর জীবনের অলংকার। সুন্দর হাসি, প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ছিল তাঁর বড় শক্তি। স্কুল থেকে দেখেছি—কথায়, চলনে, কণ্ঠস্বরে, সহভাজনে, বন্ধুত্বের সোহাগে মিশিয়ে আপন দিনকে তেমনি নিজের তা মন ছুঁয়ে যায়। বিদেশে চাকরিতে যাবার আগে কুমিল্লার দীপ্তিনন্দন কলেজের অধ্যাপক হিসেবে সামাজিক ও পেশাগতভাবে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। স্কুল থেকে কলেজে যাওয়ার নিরবিচ্ছিন্ন, মণিময় বিশ্বস্ত ছিল বলেই স্কুল ছেড়ে কলেজে যাওয়ার মতো অনেক বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রোমাঞ্চে বাধে না। কিন্তু তা হয় দীর্ঘ সময় হোত। টিকে থাকবার জন্যে সংগ্রাম করতে হোত। সবার মিলার কথা নয়। তাই, তুমি দিনের শুরু থেকে প্রায় সমস্ত সময়ই কাছে মনে লুকিয়ে রাখা কথা এবং রম-রসিকতার সঞ্চার করবার মতো সম্পর্কের এমন নিয়মে স্কুলে তো বটে, কলেজে পার হবার পরও অনেক ঘনিষ্ঠদের মধ্যে আমাদের সাক্ষাৎ, আজকের কোনো কোনো সন্ধ্যায় স্কুলে একে অপরের সঙ্গে সুযোগ পেলে দুঃখ আর ফাঁকি দেওয়ার মতো ছিল, মনোযোগী ও ভালো ছাত্রদের ছাড়া অন্যরা প্রায়ই অজুহাতে প্রতি ঘণ্টাই ক্লাসের সময় বাইরে থাকত। যামনের সারের পর বই-খাতা নিয়ে পালানোর চেষ্টা মাধ্যমিক ছিল। টিফিন সারের ক্লাস পড়া না পারার অথবা দু-চারজন মিলে একদিকে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে ক্লাস ছেড়ে পালানো কোনো কোনো সময়ে সারের এজন্ত শান্তি থেকে বাঁচার উপায় ছিল না। আমার নিজেরও কয়েকবার পালানোর কথা মনে আছে এবং এজন্ত দু-একজন সারের হাতে মার খাওয়ানোর অভিজ্ঞতাও একেবারে ভুলিনি। শুধু মারের জন্য নয়, কয়েকজন সারের ভয়টাই ছিল যে সারের মান্য করার সঙ্গে মনে কিছুটা ভক্তি থাকত। আবার এ সারের অন্যদের মতো সব ছাত্রদের এককভাবে প্রেম করতেন। যামনের সারের বিদায়ী পর্বের বিবরণায় নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রদের রেডিওতে খবরা কম ছিল বলে আমাদের তার সুযোগ নিতান্ত। একবার এক সারের টেবিলের প্রতিদানে প্রায় সবার টিফিনের খাতা বিদ্যুৎ বেগে একবারে কলেজে যাবার জন্যে জয় করে রেখেছিলাম। ছাত্রদের কাছে ভয় ছিল টিফিন মারলে আমারা খাতা সোবহান সার ছিলেন একজন। তারপরে আজকাল বেকারী থেকে একবারে কিছুটা পাওয়া যেত। তবে স্কুলের সামগ্রিক... নিজের টাকায় কোনো ছাত্র বাইরের দোকান থেকে নাশতা কিনে খেতে পারে তার সংখ্যা আমাদের সময়ও বেশি ছিল না। আবার বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে প্রয়োজনীয়তা ততখানি বিবেচনায় আসেনি। আমার বাড়ি স্কুলের কাছাকাছি হওয়ায় দুপুরবেলা টিফিন পাওয়ার জন্য বাড়িতে দৌড়ে কিছু খেয়ে যেতাম, তবে প্রায়ই মাঠে খেলার সুযোগ পেলে একেবারে ছুটির পর বাড়ি এসে খাওয়া হত। ক্লাসে মাঠে বড়দের দখল না থাকলে টিফিন পাওয়ার সুযোগ হত। ক্লাসের ছাত্ররা মিলে স্কুলে এককভাবে খেলতে পেরেছি। এ ছুটি চিত্রটার অনুপাতে নিয়ে খেলেছি। আমি নিজে চ্যাম্পিয়ন না হলেও সেটি নিয়ে খেলায় অংশগ্রহণ করেছি। আমি ফুটবল ও ভলিবল খেলতাম। ক্রিকেট খেলায় অংশগ্রহণ না করলেও আমি ভলিবল খেলায় ভালো ছিলাম, খেলায় সুযোগ বা প্রয়োজন না হলে তিনি না করতেন না। ক্রিকেট ও ফুটবল—এ দুটোই আমার প্রথম অংশগ্রহণ হয়, তারপর কলেজে গিয়ে ব্যাডমিন্টন ও কেরম ছাড়া আর কিছু খেলা হয়নি। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রতিবার অংশ নিয়েছি, আমি দু-একটি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছি, অনেক বেশি খেলায় অংশ নিয়ে পুরস্কারও বেশি জিতেছি। প্রায় প্রতিবারই দেখেছি: স্কুল ফুটবল ম্যাচ উপলক্ষে এক স্কুল এবং অন্য স্কুলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, স্কুল ফুটবল ম্যাচ খুব উৎসাহ নিয়ে আমরা লন্ডন থেকে পাড়ে গিয়ে দরবার খেলার উৎসব, শহরতলির নেতারা স্কুলে আমাদের লন্ডন থেকে শুনান ছিল। একবার ফাইনালে হেরে যাচ্ছি। আমাদের স্কুলের ফুটবল পরের খেলে উত্তেজনা মারামারির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ছাত্রীদের মধ্যে হাতাহাতি বলে একটি দূরত্বে থাকাকালীন সুযোগ খুঁজেছি। আমি এবারও জয় পেতাম। স্কুল জীবনে ক্লাস ও ক্লাসের বাইরে আমাদের শৃঙ্খলা বললেই চলে। বন্ধুত্ব, তারপর সম্প্রীতি ও শান্তির পথ ধরে চলার শিক্ষাটা স্কুলে শিক্ষকদের আমাদের দিয়েছেন। বাড়িতে এসব বিষয়ে মা-বাবার ছিটে ফোটার নির্দেশনা আমাকে দিয়েছে, তাই দেখেছি, আজও দেখি সেই দেখা থেকে। কুমিল্লা হাই স্কুলের প্রিয় প্রধান থেকে বিদায়ের এক বছর আগে স্কুলের পুনঃনির্মাণ উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখেছি। ১৮৭৬ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত চলে এসেছে একধারা। তার মাঝে জোড়া আর সাধারণ যা কিছু আছে তার সঙ্গে নিয়ে টিকে থাকার আমাদের এই স্কুল-বিদ্যালয়েই মানুষ গড়ার একটি প্রতিষ্ঠান হয়েছে। তিনি ক্লাসে ঢুকে টেবিলে কিছুটা পাহাড়, দেশে নিজের করলেন কী ব্যাপার, এ অবস্থায় কেন— একজন দাঁড়িয়ে বললেন, সেদিন কিছুটা টিফিন দেওয়ার সবাই এটা করতেন স্যার। পরক্ষণেই তিনি হেসে বললেন, সাধারণ এবং তার সঙ্গে মিলিয়ে বললেন— “খাতা দামের সভা, তাই প্রতিদিন নাশতা।” একজন ছাত্রের হাস্যরস, তারপর স্থায়ীভাবে ক্লাস শেষ করে যাবার বিষয়টি হেডস্যার ঠিক জানিয়ে ছিলেন। পরদিন তার সুমনকে পাওয়া যায়, আফিক শিপন আলী ভাই ও সেলিম ভাই মুড়িতে করে খাতা কিছুটা সঙ্গে একটি হাই চায়ের কাপ সরকার ছাত্রদের এভাবে হাতে পোস্টে দেন। Maminul Islam mollah