
mohammod maminul Islam
এলাহাবাদ-
শৈশবে মায়ের সাথে মামার বাড়ি ও আম কুড়ানোর স্মৃতি।। মমিনুল ইসলাম মোল্লা//মামার বাড়ির স্মৃতি আজও আমারহৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে। ছোটবেলায় মাঝে মাঝেই মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ি যেতাম। সেখানে ছিল বিশাল উঠান, পুকুর আর চারপাশজুড়ে নানা ধরনের গাছপালা। বিশেষ করে আমগাছগুলো ছিল আমাদের আনন্দের প্রধান উৎস। বৈশাখ মাস এলেই গাছগুলোতে কাঁচা-পাকা আমে ভরে যেত চারদিক। দুপুরের দিকে আকাশে কালো মেঘ জমে হালকা তুফান শুরু হলে আমরা সবাই দৌড়ে বের হয়ে যেতাম আম কুড়াতে। বাতাসে গাছ দুলত, আর টুপটাপ শব্দে আম মাটিতে পড়ত। হাতে গামছা বা ঝুড়ি নিয়ে কে কত বেশি আম কুড়াতে পারে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। ঝড় থেমে গেলে ভেজা মাটির গন্ধে চারপাশ ভরে যেত। সেই সময়ের আনন্দ আজও মনকে নাড়া দেয়। একবার চান্দিনা থেকে মামার বাড়ি গিয়ে দেখি অনেক হৈচৈ। একটু এগিয়ে গিয়ে জানতে পারলাম, আমাদের জন্য গাছ থেকে জাম পাড়তে গিয়ে রাখাল মামা গাছ থেকে পড়ে গিয়েছেন। গ্রামের কয়েকজন লোক তাকে ধরে পুকুরের পানিতে নামিয়ে নড়াচড়া করাচ্ছিলেন। মুরব্বিরা বলছিলেন, এতে শরীরের আঘাত কিছুটা কমে। আল্লাহর রহমতে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। পরে মামা সুস্থ হয়ে উঠেন। সেই দিনের ভয় আর উদ্বেগ এখনও চোখে ভাসে। মায়ের মুখে শুনেছি, বড় মামা বিএ পরীক্ষার আগে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন। নানা মাঝে মাঝে এসে বলতেন, “শামসু, অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমাও।” কিন্তু মামা বলতেন, “আর কয়েকটা অধ্যায় দেখে নেই।” এভাবে পড়তে পড়তে কখন যে ফজরের আজান হয়ে যেত, তারা টেরই পেতেন না। মামার অধ্যবসায় আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তখন থেকেই মনে স্বপ্ন জাগে—আমাকেও একদিন অনেক লেখাপড়া করে শিক্ষিত মানুষ হতে হবে। নানা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও সাদাসিধে মানুষ। অধিকাংশ সময় কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ ও ইবাদতে কাটাতেন। গ্রামের বিভিন্ন মানুষ তার কাছে দোয়া ও পানি পড়া নিতে আসতেন। তার একটি নলখাগড়ার কলম ছিল। মাঝে মাঝে হারিকেনের আলোয় বসে তিনি কালি ডুবিয়ে কিছু লিখতেন। সেই দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। মামার বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে প্রায়ই একটি কালো বিড়ালকে রাতের বেলায় ঘরের আশপাশে ঘুরতে দেখতাম। বিড়ালটি এলেই সবাই চুপ হয়ে যেত। ছোটবেলায় বিষয়টি আমাকে খুব ভাবাত। পরে বড়দের মুখে শুনেছি, নানীর অসুস্থতাকে ঘিরে গ্রামে নানা ধরনের লোককথা প্রচলিত ছিল। যদিও এখন বুঝি, সেগুলো ছিল মানুষের বিশ্বাস ও কল্পনার মিশ্রণ। নানী দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতেন। আমি প্রায়ই তার জায়নামাজের পাশে বসে থাকতাম। বয়সের ভারে তিনি কখনো কখনো একই আয়াত বারবার পড়তেন। তার শান্ত চেহারা ও ইবাদতের দৃশ্য এখনও আমার মনে ভাসে। কিছুদিন পর নানী ইন্তেকাল করেন। এরপর সময়ের ব্যবধানে মামার বাড়িতে যাওয়া কমে যায়। মা মারা যাওয়ার পর সেই যাতায়াত প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। তবুও শৈশবের সেই দিনগুলো আজও স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে আছে। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক, কলাম লেখক ও ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা।
