
mohammod maminul Islam
এলাহাবাদ-
শৈশবের ঘূর্ণিঝড় – ভয়াল ২৯ এপ্রিল//মমিনুল ইসলাম মোল্লা।। শৈশবের দিনগুলোতে গ্রামের জীবন ছিল শান্ত ও নিরিবিলি। কিন্তু হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় এসে সেই শান্ত পরিবেশকে ভেঙে দিয়েছিল। আমি তখন ছোট, এলাহাবাদ গ্রামের কাঁচা রাস্তা আর মাঠে খেলাধুলা ছিল প্রতিদিনের অভ্যাস। একদিন আকাশ কালো হয়ে গেল, বাতাসের গর্জন যেন ভয়ঙ্কর কোনো দানবের আগমন ঘোষণা করল। ঝড়ের রাতে আমাদের ছোট্ট কুঁড়েঘর কাঁপতে শুরু করল। মা আমাকে আঁকড়ে ধরলেন, বাবা দরজা-জানালা শক্ত করে বাঁধার চেষ্টা করছিলেন। বাইরে গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ, টিনের চাল উড়ে যাওয়ার আওয়াজ আর মানুষের চিৎকার মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি করেছিল। শিশুমনে মনে হচ্ছিল পৃথিবী বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেসময় আমার বোর্ড পরীক্ষা চলছিল। বিদ্যুৎ ছিল না। মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ঝড়ে বারবার নিভে যাচ্ছিল। হারিকেনের আলোয় মিটিমিটি করে জ্বলছিল, কিন্তু ভয়ে পড়তে পারিনি। বড় ভাই মোল্লা মনির (বর্তমানে সিনিয়র শিক্ষক, বিপাড়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) আজান দিচ্ছিলেন ঝড় থামার জন্য। মনে হচ্ছিল—এই বুঝি চালটি উড়ে গেল। আব্বা বাড়িতে না থাকলে ভয় আরও বেড়ে যেত, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি থেকে ফিরতে দেরি হলে আমি কেঁদে দিতাম। যাক, সকালে রেডিওর খবরে শুনলাম পরীক্ষা পিছিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, আমি তখনও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। পরদিন সকালে ঝড় থেমে গেলে বাইরে বেরিয়ে দেখি চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। গ্রামের অনেক ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। আমাদের খেলার মাঠে আর কোনো সবুজ ঘাস নেই, শুধু কাদামাটি আর ভাঙা ডালপালা। প্রতিবেশীরা কেউ কান্না করছে, কেউ আবার হারানো জিনিসপত্র খুঁজছে। সেই ঘূর্ণিঝড় আমাদের জীবনে শুধু ভয়ই আনেনি, এনেছিল সংগ্রামের শিক্ষা। মানুষ একে অপরকে সাহায্য করছিল, খাবার ভাগাভাগি করছিল, ভাঙা ঘর মেরামতে একসাথে কাজ করছিল। শিশু বয়সে আমি প্রথমবার বুঝতে পারলাম দুর্যোগ মানুষের জীবনকে কেমন করে বদলে দেয়, আর একতা ও সহমর্মিতা নতুন শক্তি জোগায়। আজও সেই শৈশবের ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি আমার মনে অম্লান। ঝড়ের ভয়াবহতা আমাকে শিখিয়েছে প্রকৃতির শক্তি কতটা প্রবল, আর মানুষের সাহস ও সহযোগিতা কতটা মূল্যবান। সেই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের পথচলায় এক স্থায়ী শিক্ষা হয়ে আছে—দুর্যোগ যত বড়ই হোক, মানুষের আশা ও একতা তার চেয়েও বড়। --- লেখক পরিচিতি: মমিনুল ইসলাম মোল্লা, শিক্ষক, উইকি সংকলক ও গুগল কন্ট্রিবিউটর, কুমিল্লা।
